দীর্ঘ প্রায় ১৮ বছর পর মালয়েশিয়া থেকে নিখোঁজ থাকা জাহাঙ্গীর আলম অবশেষে ফিরে এসেছেন নিজের পরিবার-পরিজনের কাছে। তিনি নরসিংদী সদর উপজেলার চরদিঘলদী ইউনিয়নের প্রত্যন্ত চরাঞ্চল জিতরামপুর গ্রামের বাসিন্দা।
জানা যায়, দরিদ্র পরিবারের সন্তান জাহাঙ্গীর আলম মেঘনা নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতেন। সংসারে চার ছেলে সন্তান রেখে এবং পঞ্চম সন্তানের অপেক্ষায় থাকা স্ত্রীকে রেখে প্রায় দুই দশক আগে ভাগ্যের সন্ধানে দালালের মাধ্যমে অবৈধভাবে মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমান তিনি। প্রথম দিকে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ থাকলেও কিছুদিন পর থেকে তার কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। দীর্ঘ সময় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় পরিবার ধরে নেয় তিনি হয়তো আর বেঁচে নেই।
পরবর্তীতে ২১অক্টোবর ২০২৫ সালে মালয়েশিয়ায় অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশন থেকে নরসিংদী সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার অফিসিয়াল মোবাইলে একটি ফোন আসে। মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ হাইকমিশনের কাউন্সিলর (লেবার) সৈয়দ শরীফুল ইসলাম জানান, সেখানে একটি ক্যাম্পে এক অসুস্থ বাংলাদেশি নাগরিক আটক রয়েছেন যার কাছে কোনো পাসপোর্ট বা পরিচয়পত্র নেই এবং অসুস্থতার কারণে তিনি কথা বলতেও পারছেন না।
এ বিষয়ে হাইকমিশনের ফেসবুক পেজে তার ছবি প্রকাশ করে পরিচয় জানার আহ্বান জানানো হলে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে অনেকেই যোগাযোগ করেন। পরে এক ব্যক্তি মন্তব্যে দাবি করেন ওই ব্যক্তির বাড়ি নরসিংদীর চরদিঘলদী ইউনিয়নে। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে যাচাই শুরু করেন উপজেলা প্রশাসন।
ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান সেলিনা আক্তার, প্রশাসনিক কর্মকর্তা শাহ্ আলম হোসেন, স্থানীয় ইউপি সদস্য ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সহযোগিতায় জাহাঙ্গীর আলমের পরিবারকে খুঁজে পাওয়া যায় এবং নিশ্চিত হওয়া যায় তিনিই ১৮ বছর আগে নিখোঁজ হওয়া সেই জাহাঙ্গীর আলম।
পরবর্তীতে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করে দ্রুত বাংলাদেশ হাইকমিশনে পাঠানো হলে মানবিক বিবেচনায় সরকারি খরচে তাকে দেশে ফেরানোর ব্যবস্থা করা হয়। গত ৭’ই নভেম্বর ২০২৫ তিনি দেশে ফিরে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মিলিত হন।
তবে দীর্ঘদিন অবৈধ অনুপ্রবেশের দায়ে কারাবন্দি থাকায় জাহাঙ্গীর আলম বর্তমানে গুরুতর অসুস্থ এবং বাকশক্তিও হারিয়ে ফেলেছেন। এতদিনে তিনি বাবা-মাকেও হারিয়েছেন। এদিকে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর তার স্ত্রীও চলে গেছেন, গড়েছেন নতুন সংসার।
উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাকে তাৎক্ষণিকভাবে ২০ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা ও কিছু উপহার সামগ্রী প্রদান করা হয়েছে। পাশাপাশি সমাজসেবা কার্যালয় থেকে তার জন্য প্রতিবন্ধী ভাতার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। বর্তমানে চিকিৎসার জন্য তাকে নরসিংদী জেলা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। জাহাঙ্গীর আলমের চিকিৎসা শেষে তাকে বাড়িতে পাঠানো হলে এখন সে পরিবারের সঙ্গেই আছেন। তার দিকে উপজেলা প্রশাসনের বিশেষ সহযোগিতা ও ইউনিয়ন পরিষদের মানবিক দৃষ্টির ভিত্তিতে ১২’ই মার্চ রোজ বৃহস্পতিবার উপজেলা প্রশাসন নরসিংদী এর পক্ষ থেকে উপজেলা নির্বাহী অফিসার আসমা জাহান সরকার দিক নির্দেশনায় ইউনিয়ন পরিষদ এর প্যানেল চেয়ারম্যান সেলিনা আক্তার ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা শাহ্আলম হোসেন সরেজমিনে জাহাঙ্গীর আলম কে ঈদ সামগ্রী ও ঈদের জামা উপহার দিয়ে পৌছেদেন। উক্ত ঘটনায় প্রশংসায় ভাসছেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার আসমা জাহান সরকার ও সংশ্লিষ্ট সকল প্রতিনিধি ও কর্মকর্তাবৃন্দ।
এ ঘটনায় উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে উপজেলা নির্বাহী অফিসার আসমা জাহান সরকার সকলকে সতর্ক করে বলেছেন, কেউ যেন দালালের প্রলোভনে পড়ে অবৈধভাবে বিদেশে যাওয়ার ঝুঁকি না নেন। একটি ভুল সিদ্ধান্ত যেন আর কারো জীবনে দীর্ঘদিনের কান্নার কারণ না হয় এটাই সবার প্রত্যাশা।