আজ ১০ মহররম, পবিত্র আশুরা।
এ দিনটি শুধু ইতিহাসের একটি তারিখ নয়, বরং মানবতা, ন্যায় এবং আত্মত্যাগের এক মহৎ গাথা। হিজরি ৬১ সালের এই দিনে, ইরাকের কারবালার প্রান্তরে ঘটেছিল এক হৃদয়বিদারক ঘটনা—যেখানে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রাণপ্রিয় দৌহিত্র ইমাম হোসাইন (রা.) পরিবার-পরিজনসহ শাহাদাত বরণ করেন। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—এ শুধু কি শোক, না কি এর গভীরে আছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক সাহসী প্রতিবাদের পাঠ?
কারবালার সেই ঘটনা ইসলামের ইতিহাসে যেমন করুণ, তেমনি তা শিক্ষণীয়। শক্তি, দমন-পীড়ন আর স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে নিরস্ত্র একদল মানুষের অমোঘ প্রতিবাদ এই আশুরা। অন্যায় ও অত্যাচারের কাছে মাথানত না করার যে চেতনা ইমাম হোসাইন রেখে গেছেন, তা আজও কোটি মানুষের মনে অনুরণন তোলে।
ইমাম হোসাইন (রা.) শুধু এক রাজনৈতিক সংগ্রামে নামেননি। তিনি মূলত মানবতার পক্ষে, ন্যায়বিচারের পক্ষে, ইসলামের মূল আত্মাকে রক্ষার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। ইয়াজিদের স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে তিনি প্রমাণ করে গেছেন—সত্যের জন্য প্রয়োজনে জীবন দেওয়া যায়, কিন্তু মাথা নত করা যায় না।
বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে আজ মুসলিম সম্প্রদায় এই দিনটিকে গভীর শোক ও শ্রদ্ধার সঙ্গে পালন করছে। শিয়া মুসলিমরা তাজিয়া মিছিল, মাতম ও কারবালার ঘটনা স্মরণ করে থাকেন। সুন্নি মুসলিমদের মধ্যেও দিনটি নানা দোয়া-মাহফিল, রোজা পালন এবং ধর্মীয় আলোচনার মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয়। ইসলামী ঐতিহ্য অনুসারে এই দিনেই ঘটে আরও অনেক ঐতিহাসিক ঘটনা—যেমন, হজরত মুসা (আ.)-এর ফেরাউনের জুলুম থেকে মুক্তি, হজরত নূহ (আ.)-এর তুফানের অবসান ইত্যাদি।
তবে আশুরার সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—ত্যাগ ও সত্যে অবিচল থাকা। ইমাম হোসাইনের শহাদাত শুধু ধর্মীয় আচার নয়, এটি একটি আদর্শ—যা সকল প্রজন্মকে মনে করিয়ে দেয়, সত্যের পথে চলা সহজ নয়, কিন্তু সেটিই মানবতার প্রকৃত পথ।
কারবালার প্রান্তরে যে রক্ত ঝরেছিল, তা ছিল মুক্তির রক্ত। এক শাশ্বত বার্তা বহন করে নিয়ে এসেছিল পৃথিবীর প্রতিটি নিপীড়িত মানুষের জন্য—জুলুম যতই শক্তিশালী হোক, শেষ জয় সত্যেরই হবে।
আশুরা তাই শুধু কান্নার দিন নয়, এটি আত্মনিরীক্ষার, আত্মত্যাগের, ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর দিন।